স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট

বিশ্বব্যাপী পৌনে ৩ লাখ কোটি ডলার সামরিক ব্যয়ের রেকর্ড

গত বছর শতাধিক দেশ আগের বছরের তুলনায় সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে এ খাতের বৈশ্বিক ব্যয়ে।

গত বছর শতাধিক দেশ আগের বছরের তুলনায় সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে এ খাতের বৈশ্বিক ব্যয়ে। অন্যান্য খাতে খরচ কমিয়ে যুদ্ধ সরঞ্জাম ক্রয়ে ব্যয় বাড়িয়েছে অনেক দেশ। এছাড়া ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও গাজায় ইসরায়েলি হামলায় বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়ের বড় একটি অংশ ব্যবহার হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২৪ সালে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় রেকর্ড পৌনে ৩ ট্রিলিয়ন বা ৩ লাখ কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন জানিয়েছে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই)। খবর রয়টার্স ও আনাদোলু।

সুইডেনভিত্তিক সংঘাতবিষয়ক গবেষণা সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের সব অঞ্চলে প্রতিরক্ষা ব্যয় বেড়েছে। এর মধ্যে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে ব্যয় বৃদ্ধির হার ছিল উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি।

২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয় ২ দশমিক ৭২ ট্রিলিয়ন বা ২ লাখ ৭২ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে, মূল্যস্ফীতি বিবেচনা সত্ত্বেও যা আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। এটি স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধির রেকর্ড। এ নিয়ে টানা দশম বছরের মতো বৃদ্ধি পেল বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা ব্যয়।

গত বছর শতাধিক দেশ সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে এসআইপিআরআই। এ প্রবণতা নিয়ে সতর্ক করছেন সংস্থার প্রতিরক্ষা ব্যয় ও অস্ত্র উৎপাদন কর্মসূচি বিভাগের গবেষক শাও লিয়াং। তিনি বলেন, ‘সরকারগুলো ক্রমাগত সামরিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এতে তারা প্রায়ই অন্যান্য খাতের খরচ কমিয়ে দিচ্ছেন। এ অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাটছাঁট দীর্ঘমেয়াদে সমাজের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।’

২০২৪ সালে সামরিক ব্যয় বৈশ্বিক জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ হিস্যা দখলে নিয়েছে। এতে প্রধান চালকের আসনে ছিল ইউরোপ, যার মধ্যে রাশিয়াও অন্তর্ভুক্ত। এ অঞ্চলে আগের বছরের তুলনায় খরচ ১৭ শতাংশ বেড়ে ৬৯ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ এবং ন্যাটো মিত্রতার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দেহের ফলে ইউরোপে সামরিক ব্যয়ের এ বাড়বাড়ন্ত, যা অঞ্চলটির এ খাতের ব্যয়কে শীতল যুদ্ধের পর সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে গেছে। গত বছর রুশ সামরিক ব্যয় আনুমানিক ১৪ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে পৌঁছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৩৮ শতাংশ বেশি এবং ২০১৫ সালের তুলনায় দ্বিগুণ। এটি রাশিয়ার জিডিপির ৭ দশমিক ১ এবং দেশটির মোট সরকারি ব্যয়ের ১৯ শতাংশের সমতুল্য।

অন্যদিকে ইউক্রেনের সামগ্রিক সামরিক ব্যয় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৬ হাজার ৪৭০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা রাশিয়ার ব্যয়ের ৪৩ শতাংশ। তবে জিডিপির ৩৪ শতাংশ ব্যয় করে ইউক্রেন বিশ্বের সর্বোচ্চ সামরিক বোঝার অধিকারীতে পরিণত হয়েছে। এসআইপিআরআইয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক দিয়েগো লোপেজ দা সিলভা সতর্ক করে বলেছেন, ‘ইউক্রেন বর্তমানে তার সব কর-রাজস্ব সামরিক খাতে ব্যয় করছে। এত সংকুচিত আর্থিক অবস্থায় ইউক্রেনের পক্ষে সামরিক ব্যয় আরো বাড়ানো চ্যালেঞ্জিং হবে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিজস্ব উৎস ছাড়াও পশ্চিমা মিত্রদের আর্থিক ও সামরিক সহায়তা পেয়ে থাকে ইউক্রেন।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৯৯ হাজার ৭০০ কোটি ডলার, যা ২০২৪ সালে ন্যাটোর সামগ্রিক ব্যয়ের ৬৬ শতাংশ এবং বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়ের ৩৭ শতাংশ।

ইউরোপের একাধিক দেশ রেকর্ড পরিমাণে সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে গত বছর। জার্মানিতে ২৮ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৮ হাজার ৮৫০ কোটি ডলার। ফলে জার্মানি বিশ্বে চতুর্থ বৃহত্তম এবং মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে বৃহত্তম সামরিক ব্যয়কারী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুসারে, ন্যাটোর সদস্যরা সম্মিলিতভাবে ১ লাখ ৫০ হাজার ৬০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে, যা বৈশ্বিক মোট প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ৫৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে ৩২টি ন্যাটো দেশের মধ্যে ১৮টি জিডিপির ২ শতাংশ সামরিক ব্যয়ের লক্ষ্য পূরণ করেছে, যা রেকর্ড। তবে ন্যাটো মিত্রদের আরো বেশি ব্যয় করতে চাপ দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।

২০২৪ সালে মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় ১৫ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। ইসরায়েলের ব্যয় ৬৫ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ৬৫০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা ১৯৬৭ সালের পর সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি। এ ব্যয়ের বেশির ভাগ অংশ গেছে গাজায় গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলমান এ হামলায় ৫২ হাজার ২০০-এর বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া লেবাননে সামরিক ব্যয় ৫৮ শতাংশ বেড়ে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে।

ইনস্টিটিউটের সামরিক ব্যয় এবং অস্ত্র উৎপাদন কর্মসূচির গবেষক জুবাইদা করিম বলেন,"‘মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ সামরিক ব্যয় বাড়াবে এমন ভাবা হলেও বড় ধরনের বৃদ্ধি কেবল ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। গাজা যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় অন্য দেশগুলো হয় উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যয় বৃদ্ধি করেনি অথবা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে তা করতে বাধা পেয়েছে।’

সামরিক খাতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ চীন গত বছর ব্যয় ৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৩১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে উন্নীত করেছে। জাপান ২১ শতাংশ বাড়িয়ে ৫ হাজার ৫৩০ কোটি ডলারে তুলেছে, যা ১৯৫২ সালের পর সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধি।

আরও